চাকরি করতে রাশিয়া গিয়ে প্রতারকদের খপ্পরে, ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত

ডেস্ক রিপোর্টরাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় নিহত যুবক আব্দুর রহিমের বাড়িতে চলছে মাতম।ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের নামাপাড়া গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে আব্দুর রহিম (৩০)। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। জমিজমা নেই বললেই চলে।

তার বাবা স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। যে টাকা বেতন পান তা দিয়ে সংসার চালিয়ে ছেলেদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারেন না।জানা যায়, রহিম ২০১১ সালে ধামর আফাজিয়া দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল, ২০১৪ সালে ফুলবাড়িয়া কেআই সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা থেকে আলিম পাস করেন। টাঙ্গাইলে সরকারি এম এম আলী কলেজ উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়া অবস্থায় চরম অভাব-অনটনের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দেন।

ছোট দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের অভাব দূর করতে ৬ লাখ টাকা ঋণ করে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান। প্রায় ৭ বছর সিঙ্গাপুরের থাকেন। তেমন কিছু করতে পারেননি। ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে দেশে চলে আসেন।
এরপর অন্য দেশে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছিলেন। তিন লাখ টাকা ঋণ করে এক দালালের মাধ্যমে সিনোপেক কম্পানির মাধ্যমে ভিসা নিয়ে ২০২৪ সালে ৭ ডিসেম্বর রাশিয়ায় যান। সেখানে একটি শিপে কাজ করেন। বায়ু বিদ্যুৎ কম্পানিতে চাকরির কথা বলে গত পাঁচ মাস আগে জমি বন্ধক দিয়ে বাড়ি থেকে আরো ৩ লাখ টাকা নিয়েছেন। নতুন ও পুরাতন কম্পানির বেতন পেয়ে গত ১৬ এপ্রিল ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠিয়েছেন।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, রহিম রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সেনা সদস্য হিসেবে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার বিষয়টি তারা জানতেন না।আজ মঙ্গলবার (১২ মে ) দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুটিজানা নামাপাড়া গ্রামের মুন্সিবাড়িতে চলছে মাতম। আশপাশের গ্রামের মানুষসহ প্রতিবেশীদের উপচে পড়া ভিড়। বাড়িতে ভাঙা পুরাতন টিনশেড দুটি ঘর। নতুন বাড়ি করার জন্য ইট ক্রয় করা। টিনশেড একটি ঘরে মায়ের আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে আছে। ঘরের বাহিরে বৃদ্ধ বাবা কান্না করছেন অঝোরে। কেউ তাদের কান্না থামাতে পারছে না। ছেলের শোকে কাতর বাবা-মাকে স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মু. কামরুল হাসান মিলন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ বোঝানোর চেষ্টা করছেন। পরিবারের একটাই দাবি, তাদের ছেলের লাশটা যাতে দেশে আনার ব্যবস্থা করেন তারা।

প্রতিবেশীরা জানায়, রহিম শান্ত প্রকৃতির ছেলে ছিলেন। পরিবারের অভাবের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে বিদেশ গিয়েছিলেন। বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে ছোট দুই ভাইকে লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসার চালাতেন। এখন পরিবারের আয়-রোজগার করা মতো কেউ রইল না।

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ৭ বছর সিঙ্গাপুরের থাকার পর বাড়িতে এসে এক বছর থাকেন রহিম। এক দালালের মাধ্যমে সিনোপেক কম্পানির মাধ্যমে গত ১৮ মাস আগে রাশিয়া যান। সেখানে গিয়ে তিন থেকে চার মাস পর পর সামান্য কিছু টাকা পাঠাতেন। তা দিয়ে সংসারের পাশাপাশি ছোট দুই ভাই আব্দুর রহমান ও আব্দুর রাজ্জাকের লেখাপড়ার খরচ দিতেন। গত পাঁচ মাস আগে বাড়ি থেকে তিন লাখ টাকা নিয়ে নতুন করে একটি বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাকরি নেন বলে জানতেন পরিবারের সদস্যরা। গত এক মাস আগে প্রায় দেড় লাখ টাকা বাড়িতে পাঠিয়েছেন। এতে করে পরিবারের সদস্যরা মনে করে ভালো কাজ পেয়েছেন।

গত ২৮ তারিখ আব্দুর রহিম তাঁর ছোট ভাইয়ের মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে বলেছেন, তিনি যেখানে কাজ করেন, সেখানে মোবাইলে নেটওয়ার্কের সমস্যা কথা বলা যায় না। কোনো কথা থাকলে মেজেস বলে রাখতে বলেন, সুযোগ মতো উত্তর দেবেন। এর পর থেকেই মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। আব্দুর রহিমের সঙ্গে রাশিয়ায় একটি ক্যাম্পে রুশ সেনা সদস্য হিসেবে থাকতেন লিমন দত্ত নামের এক যুবক। তিনি গত রবিবার তার মেজো ভাই আব্দুর রাজ্জাকের মোবাইল ফোনে জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় তার একটি পা হারিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আব্দুর রহিম ও কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার রিয়াদ নামে আরেকজন মারা গেছেন। রহিমের পরিবারের কিশোরগঞ্জে রিয়াদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে তিনিও মারা গেছেন।

নিহতের মেজো ভাই আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘প্রথমে ওয়ার্ককশপের কাজ নিয়ে রাশিয়া গিয়েছিলেন, এক দালাল নতুন কম্পানিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় যা আমরা জানতাম না। গত ২ এপ্রিল রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় আব্দুর রহিমের মৃত্যু হয়েছে বলে তার বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পেরেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রুশ সেনার পোশাক পরা ও বন্দুক হাতে আব্দুর রহিমসহ ৫ জনের একটি ছবিও দেখতে পাই।’

নিহত আব্দুর রহিমের বাবা আজিজুল হক বলেন, ‘মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা ও জমি বন্ধক দিয়ে ৬ লাখ টাকা খরচ করে পোলাডারে ওয়াল্ডিংয়ে কাজে প্রবাসে পাঠিয়েছিলাম। পরে বায়ু বিদ্যুৎ কম্পানিতে চাকরির কথা বলে আরো ৩ লাখ টাকা নেয়। রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি জানতাম না। পরে জানতে পারি যুদ্ধে ড্রোন হামলায় মারা গেছে। ছেলের লাশ দেশে আনার জন্য সরকারের কাছে আকুল আবেদন করছি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ জানিয়েছেন, নিহতের লাশ দেশে আনার ব্যাপারে পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফরওয়ার্ডিং করে দ্রুত সময়ে লাশ আনার বিষয়ে কাজ করব। মানবিক সহায়তাসহ প্রয়োজনীয়ভাবে নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হবে। চিহ্নিত দালালের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে সে বিষয়েও আইনগত সহায়তা দেওয়া হবে।

সাংসদ অধ্যক্ষ মু. কামরুল হাসান মিলন বলেন, ‘দালালের খপ্পরে পড়ে এই ক্ষতিগুলো হচ্ছে। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছে লাশ আনার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া মেইন্টেইন করতে হয়। নিহতের লাশ আনতে সর্বোচ্চ সহায়তা করব। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top