সাগরে ভেসে যাওয়া স্ত্রীর খোঁজে ১৪ বছর ধরে ডুব দিয়ে যাচ্ছেন স্বামী

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

প্রতি মাসে দুইবার, একটি ছোট মাছ ধরার নৌকায় চড়ে উপকূল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সাগরে যাত্রা করেন ইয়াসুও তাকামাতসু। জাপানের উত্তর-পূর্ব মিয়াগি প্রিফেকচারের ওনাগাওয়া বন্দর থেকে নৌকা নিয়ে এই যাত্রা শুরু করেন তিনি। ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুখে মাস্ক, এয়ার ট্যাংক এবং ওয়েট বেল্ট পরে একই রুটিন মেনে চলেছেন এই জাপানি নাগরিক ইয়াসুও।

নৌকাটি যথেষ্ট দূরে চলে গেলে নিচের ঠান্ডা পানিতে ঝাঁপ দেন তিনি। প্রতিটি ডুবের সঙ্গে তিনি সেই একই সাগরে ফিরে যান, যে সাগর তার স্ত্রী ইউকোকে কেড়ে নিয়েছিল।

একটি বিশাল, কালো সুনামির ঢেউ উপকূলীয় শহর বরাবর স্থলভাগের দিকে ধেয়ে আসছে, রাস্তাঘাট ও দালানকোঠার ওপর দিয়ে বন্যার জল বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর সম্মুখভাগে দ্রুতগামী জলের তোড়ে দুটি হালকা রঙের গাড়ি ভেসে উঠছে। পটভূমিতে, মাছ ধরার নৌকাগুলো প্লাবিত বন্দরেই রয়ে গেছে।

সুনামি

২০১১ সালে জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে আঘাত হানা সুনামিতে ইউকো যে ব্যাংকের ছাদে কাজ করছিলেন, সেখান থেকে তিনি ভেসে যান।

সুনামিটি তার পথের সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। বিশাল ঢেউটি উপকূল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিল।
ইয়াসুও সেদিন সকালে তাকে তার কর্মস্থলে নামিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের সংক্ষিপ্ত গাড়িযাত্রার সময় তারা রাতের খাবারে কী খাবেন তা নিয়ে কথা বলেছিলেন।

যখন সুনামির সতর্কীকরণ সাইরেন বেজে উঠল, ইউকো এবং তার ১২ জন সহকর্মী ভবনটির ছাদে উঠে গেলেন। সেখান থেকে তিনি তার স্বামীকে একটি বার্তা পাঠালেন, ‘তুমি কি নিরাপদ আছো? আমি বাড়ি যেতে চাই।’

মেসেজটা দেখে ইয়াসুও ভেবেছিলেন তার স্ত্রী নিরাপদে আছে। কিন্তু পরদিন, বেঁচে যাওয়া মানুষজন যেখানে আশ্রয় নিয়েছিল, সেই পৌর হাসপাতালে গিয়ে তিনি দেখলেন তার স্ত্রী সেখানে নেই। তিনি বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল যে সুনামি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এরপর আমি আর উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না। আমার সমস্ত শক্তি যেন ভেসে গিয়েছিল।’

পানি নেমে যাওয়ার পর পরবর্তী দিন ও সপ্তাহগুলোতে জাপানের উপকূলরেখা থেকে হাজার হাজার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু ইউকোর মতো অনেক ভুক্তভোগী নিখোঁজই থেকে যান। দুই বছর ধরে ইয়াসুও জাপানি উপকূলরক্ষী বাহিনীর ডুবুরিদের মৃতদেহ খুঁজতে এবং জিনিসপত্র ও স্মৃতিচিহ্ন তুলে আনতে দেখেছিলেন।

তারপর তিনি একটি সিদ্ধান্ত নিলেন। ‘আমি ডুব দিতে শিখলাম। আমার মনে হতো, যতদিন আমি ডুব দেওয়া চালিয়ে যাব, একদিন তার সঙ্গে আমার দেখা হবে,’ বলেন তিনি। পঞ্চাসের কোঠার ইয়াসুও ডাইভিং চালিয়ে গেছেন এবং এখন পর্যন্ত ৭৬০টিরও বেশি ডাইভ সম্পন্ন করেছেন।

জীবিতদের মধ্যে মৃত

জাপানে দৈনন্দিন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মৃতদের স্মরণ করা হয় এবং বিশ্বাস করা হয় যে, তাদের মৃত্যুর অনেক পরেও তারা অন্যদের জীবনে থেকে যান।

বৌদ্ধধর্মের কুয়ো প্রথার মধ্যে মৃত প্রিয়জনদের শান্তি ও মঙ্গল কামনায় কবর বা বেদীর পাশে নৈবেদ্য নিবেদন এবং প্রার্থনা করার মতো আচার-অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত। তবে, যেহেতু ইউকোর দেহাবশেষ কখনও উদ্ধার করা যায়নি, ইয়াসুও এভাবে কোনো কবরে শ্রদ্ধা জানাতে পারেননি।

বরং, এটি একটি অনুসন্ধান হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা এখন নিজস্ব এক রীতিতে পরিণত হয়েছে—স্মরণ ও সংযোগের এক কর্মকাণ্ড। ইয়াসুও বলেন, ‘বারবার ডুব দেওয়ার পর আমার মনে হতে লাগল যে সে হয়তো আশেপাশেই আছে। এটা কবরে গিয়ে স্মরণ করার চেয়ে একটু আলাদা, কারণ সে কবরে নেই। বরং মনে হয় যেন আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।’

এই দুর্যোগের কারণে ইয়াসুওর বিশ্বাসের পরীক্ষা হয়েছে। যখন তিনি সমুদ্রের গভীরে থাকেন এবং বছরের পর বছর ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ দেখেন, তখন তার দুঃখ হয়।

তিনি বলেন, ‘যখন আমি ধ্বংসস্তূপগুলোর দিকে তাকাই, তখন ভাবি, এইসবের মধ্যে দিয়ে তার পক্ষে উপরে উঠে আসা সম্ভব ছিল না। আর যখন আমি এটা ভাবি, তখন আমার সত্যিই কান্না চলে আসে।’

তবে, ইয়াসুও সমুদ্রকে ঘৃণা করেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মেনে নিয়েছেন যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনিবার্য এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি বলেন ‘আমি এটাকে ঠিক ঘৃণা করি না বা সেরকম কিছু না। তখন সুনামি হয়েছিল, আর সমুদ্র উত্তাল ছিল। কিন্তু অন্যদিকে, অনেক দারুন জিনিস ধরা যায়। আর দৃশ্যও খুব সুন্দর।’

এইভাবে, ইয়াসুও বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হওয়া এক জনগোষ্ঠীর মনোভাবের মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠেন।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী তোহোকুতে তিনি যেখানে থাকেন, সেখানে সুনামি ও ভূমিকম্প কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয় এবং উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মন্দির ও ধ্বংসাবশেষ প্রকৃতির শক্তির কথা এবং মানুষ যে সেই প্রাকৃতিক পরিবেশেরই একটি অংশ, তা স্মরণ করিয়ে দেয়।

ডুব দিতে যাওয়া-আসার পথে ইয়াসুও হাসিখুশি ও বন্ধুত্বপূর্ণ থাকেন। যখন তিনি ইউকোর কথা বলেন, তখন তার কণ্ঠে এক ধরনের শ্লেষাত্মক রসিকতা ফুটে ওঠে। ‘আমাদের দেখা হলে, আমার মনে হয় অবাক হয়ে সে-ই হয়তো আমাকে প্রথমে বলত, ‘তোমার বয়স হয়ে গেছে’।’

কিন্তু তার ডুবগুলো আত্ম-প্রতিফলনের সময়। পানির ৫০ মিটার নিচে, তিনি ধ্বংসের চক্রে সৃষ্ট এক বিধ্বস্ত জলজ ভূদৃশ্যের উপর দিয়ে সাঁতার কাটেন। তার মতে,, ‘পানির নিচে নানা ধরনের গঠন রয়েছে। কিছু কিছু পাহাড়ের মতো, আর আপনি সেগুলোর উপর দিয়ে ভেসে থেকে উপর থেকে নিচের দিকে তাকাতে পারেন,” তিনি বলেন, “তাই এটা সত্যিই কিছুটা ওড়ার মতো অনুভূতি দেয়।’

ইউকোর সঙ্গে দেখা হওয়ার অনেক আগে থেকেই ইয়াসুও এই সমুদ্রের পাশেই বড় হয়েছেন। তিনি এর পানিতেই সাঁতার কাটতে ও মাছ ধরতে শিখেছিলেন এবং তার যতদূর মনে পড়ে, এই পানিই তার জীবনকে গড়ে তুলেছে।

এখন, পানির নিচে ধ্বংসাবশেষ দেখে সেটিকে প্রকৃতির অবিরাম পরিবর্তনচক্রের অংশ হিসেবেই দেখেন তিনি। সেখানে আধভাঙা গাড়ি আছে এবং অন্যান্য জিনিস কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীরে পরিণত হয়েছে। সেখানে মাছ আসে এবং পরে ডিম পাড়ে।

১৫ বছর পরেও শোক ইয়াসুও’র সঙ্গে রয়ে গেছে। সমুদ্রও রয়ে গেছে। এটি ছিল তার ৭৬৩তম ডুব। শিগরগিরই তিনি ইউকোর কাছাকাছি থাকতে আবারও সাগরে ফিরবেন।

এই নিবন্ধটি বিবিসি ডব্লিউএস-এর ‘হার্ট অ্যান্ড সোল’-এর একটি পর্ব অবলম্বনে রচিত, যা মেসেজ হার্ড এবং হিরোমি তানোউয়ে প্রযোজনা করেছেন।

বিবিসি বাংলা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top