উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই ফিজিওথেরাপি : চিকিৎসার পর পুনর্বাসনেও ছুটতে হচ্ছে শহরে

জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়

স্ট্রোক, পক্ষাঘাত, দুর্ঘটনায় আহত হওয়া, হাড়-জোড়ের সমস্যা কিংবা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রোপচারের পর অনেক রোগীর জন্য ফিজিওথেরাপি হয়ে ওঠে সুস্থ জীবনে ফেরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ওষুধে রোগের মূল চিকিৎসা হলেও শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়া, পেশিশক্তি ও দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন হয় নিয়মিত পুনর্বাসন চিকিৎসার। অথচ দেশের অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখনো ফিজিওথেরাপি সেবার ব্যবস্থা নেই।

ফলে চিকিৎসার পরও রোগীদের ছুটতে হচ্ছে জেলা শহর কিংবা বিভাগীয় শহরের হাসপাতাল ও বেসরকারি ফিজিওথেরাপি সেন্টারে। প্রত্যন্ত এলাকার অনেক রোগীর জন্য এতে চিকিৎসার পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে যাতায়াতের খরচ, সময় ও শারীরিক ভোগান্তি। নিয়মিত থেরাপি প্রয়োজন এমন রোগীদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি।

সি‌লে‌টের ওসমানী নগর উপ‌জেলার খা‌দিমপুর ক‌মিউ‌নি‌টি ক্লি‌নি‌কের (সিএইচ‌সি‌পি)স্বাস্থ‌্যকর্মী আ‌মিনুর রহমান জানান, উপজেলা পর্যায়ে ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা না থাকায় প্রয়োজনীয় সেবা নিতে অনেক রোগীকেই দূরের প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। বিশেষ করে স্ট্রোক বা পক্ষাঘাতের মতো রোগে দীর্ঘদিন নিয়মিত থেরাপি প্রয়োজন হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি ব্যবস্থায় এ সেবা পাওয়া গেলে রোগী ও স্বজনদের জন্য তা অনেকটাই সহজ হতো।

চিকিৎসা শেষ হলেও শেষ হয় না লড়াই

ফিজিওথেরাপির প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় চিকিৎসার পরবর্তী সময়ে। স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর হাত-পায়ের শক্তি ও নড়াচড়া ফিরিয়ে আনা, দুর্ঘটনার পর হাঁটাচলার সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, অস্ত্রোপচারের পর শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গের কার্যক্ষমতা বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রে নিয়মিত থেরাপি প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে এই সেবা না থাকায় অনেক রোগীকেই চিকিৎসার জন্য এক জায়গা এবং পুনর্বাসনের জন্য আরেক জায়গায় যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ স্থানীয় পর্যায়ের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

ফিজিওথেরাপিস্ট সুজন ইসলাম বলেন, ফিজিওথেরাপি শুধু ব্যথা কমানোর চিকিৎসা নয়; রোগীর স্বাভাবিক চলাফেরা, পেশিশক্তি ও দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ব্যবস্থায় এ সেবা চালু হলে সাধারণ মানুষ অনেক উপকৃত হবে।

বাড়তি ব্যয়ের চাপ

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপি নিতে গেলে রোগীকে প্রতিটি সেশনের জন্য আলাদা অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় যাতায়াত ও স্বজনের সময়ের মূল্য। কোনো রোগীর যদি সপ্তাহে একাধিক দিন থেরাপির প্রয়োজন হয়, তাহলে মাস শেষে পরিবারের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অর্থের অভাবে নিয়মিত থেরাপি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এতে রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই হতে পারে সমাধান

পটুয়াখালী জেলার দুমকি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও অর্থোপেডিক সার্জন ডা. মীর শহিদুল হাসান শাহীন বলেন, চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফিজিওথেরাপি ইউনিট থাকলে রোগীরা স্থানীয় পর্যায়েই প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারেন।

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি ফিজিওথেরাপি ইউনিট চালু করা হলে শুধু স্ট্রোক বা পক্ষাঘাতের রোগী নয়, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, হাড়-জোড়ের সমস্যায় আক্রান্ত রোগী, অস্ত্রোপচারের পর পুনর্বাসন প্রয়োজন এমন রোগীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ উপকৃত হতে পারেন।

স্থানীয় পর্যায়ে এ সেবা চালু হলে জেলা বা বিভাগীয় শহরে রোগীর চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে পুনর্বাসনসেবার সমন্বয় আরও কার্যকর হতে পারে।

সেবার পাশাপাশি তৈরি হবে কর্মসংস্থান

উপজেলা পর্যায়ে ফিজিওথেরাপি ইউনিট চালুর সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও রয়েছে। ফিজিওথেরাপিস্ট, ফিজিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট ও প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল নিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে একদিকে যেমন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে এই খাতের প্রশিক্ষিত তরুণদের জন্য সরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।

স্বাস্থ্যসেবার আধুনিক ধারণায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় উপজেলা পর্যায়ে ফিজিওথেরাপি সেবা চালু করা সময়ের প্রয়োজন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রত্যাশা স্থানীয় সেবার

চিকিৎসার জন্য মানুষকে শুধু শহরমুখী না করে উপজেলা পর্যায়েই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য দীর্ঘদিনের। সেই ব্যবস্থায় ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসনসেবাকেও যুক্ত করা হলে প্রত্যন্ত এলাকার রোগীদের জন্য তৈরি হতে পারে নতুন সুযোগ।

একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফিজিওথেরাপি ইউনিট হয়তো সব ধরনের পুনর্বাসন চিকিৎসার বিকল্প হবে না। তবে প্রাথমিক ও নিয়মিত থেরাপির সুযোগ স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হলে অনেক রোগীর দূরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে, চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি কমতে পারে। তাই প্রয়োজন ও রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় ধাপে ধাপে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ফিজিওথেরাপি সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top