স্থানীয় নির্বাচনে যেসব যোগ্যতায় মিলবে বিএনপির সবুজ সংকেত

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

জাতীয় নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার দরজায় কড়া নাড়ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর, অর্থাৎ আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে এই নির্বাচনী উৎসব শুরু হতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন বা সমর্থনের ক্ষেত্রে ‘অতীতের ত্যাগ’ এবং ‘জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা’ এই দুটি বিষয়কেই মূল মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করেছে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

সরকার ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন সম্পূর্ণ করার একটি মহাপরিকল্পনা রয়েছে। বাজেটের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে এই নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হবে, যার সূচনা হতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে।

কার্যত স্থানীয় সরকার নির্বাচনি ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়ে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ের প্রার্থীরা এখন কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন। অনেকেই সবুজ সংকেত পেতে হাইকমান্ডের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তবে দলটির হাইকমান্ড যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে ইতোমধ্যে কয়েক দফা মাঠ জরিপ চালিয়েছে এবং তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

মনোনয়নের মূল মানদণ্ড যা থাকছে

যাকে মনোনয়ন দিলে সাধারণ ভোটাররা খুশি হবে, তেমন প্রার্থীর হাতেই স্থানীয় সরকারের টিকিট তুলে দেবে বিএনপি। এক্ষেত্রে দলটির নীতিগত অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। প্রার্থীর যোগ্যতা মূল্যায়নে প্রধানত ৩টি মৌলিক বিষয়কে মানদণ্ড ধরা হচ্ছে:

ত্যাগ ও সংগ্রাম: বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন-সংগ্রামে যিনি সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং রাজপথে মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, তিনি অগ্রাধিকার পাবেন।

সততা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা: ব্যক্তিগত জীবনে সৎ এবং এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে যার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রয়েছে।

শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জনসম্পৃক্ততা: উচ্চশিক্ষিত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এবং নিজের নির্বাচনী এলাকায় যার শক্তিশালী লোকাল বেস বা জনপ্রিয় ভিত্তি রয়েছে।

মেয়র পদে ‘বড় চমক’ ও প্রবীণ-তরুণের সমন্বয়

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে,বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভার মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবার প্রার্থী মনোনয়নে বড় ধরনের চমক থাকতে পারে। এমন কিছু ক্লিন ইমেজের নতুন মুখকে সামনে আনা হতে পারে, যা সাধারণের চিন্তার বাইরে। আবার মাঠে গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে অনেক সিনিয়র ও প্রভাবশালী নেতাও শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত হতে পারেন।

দলীয় প্রধান তারেক রহমানের কাছে ইতোমধ্যে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের নেতাকর্মীদের একটি বিস্তারিত ‘আমলনামা’ বা ট্র্যাক রেকর্ড জমা রয়েছে। কোনো ধরনের অপকর্মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তিনি টিকিট পাবেন না—এটি স্পষ্ট। তবে মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রবীণ ও তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচন মূলত জনসম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করে। যেহেতু এই নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না, সে ক্ষেত্রে এলাকায় যাদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত, পাশাপাশি দলের প্রতি অতীত ত্যাগ-তিতিক্ষা রয়েছে, তাদেরই মনোনয়ন বা সমর্থনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’

দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘বড় দলে মনোনয়নপ্রত্যাশী বেশি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দলের প্রতি ত্যাগ ও অবদানই হবে মূল বিচার্য। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ কারও নেই।’

জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘যারা দলের ত্যাগী ও বিশ্বস্ত এবং বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, তারাই অগ্রাধিকার পাবেন। তৃণমূল এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।’

বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা

জয়নুল আবদিন ফারুক এমপি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। অতীতের মতো হানাহানির স্থানীয় নির্বাচন তিনি করতে চান না।’

তিনি বলেন, ‘সমাজের যারা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি, যারা কোনো অপকর্মে জড়িত নয়, অতীতে আন্দোলন সংগ্রামে যাদের ভূমিকা আছে তাদেরকেই বেছে নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে বড় জয়ের পর বিএনপির জন্য এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনটি নিজেদের তৃণমূল ভিত্তি ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখার এক নতুন অগ্নিপরীক্ষা।

দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন হওয়ার কারণে এবার স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় নির্দলীয় বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি যদি শুধু দলীয় ত্যাগের দোহাই দিয়ে জনবিচ্ছিন্ন কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের ‘ক্লিন ইমেজ’ ও ‘মেধাবী নেতৃত্ব’ বাছাইয়ের যে কৌশল, তা যদি তৃণমূল পর্যন্ত বজায় থাকে এবং প্রবীণ ও তরুণের সঠিক সমন্বয় ঘটে, তবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিএনপি এক নতুন ধারার নেতৃত্ব তৈরি করতে সক্ষম হবে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন করা এবং বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।

এশিয়া পোস্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top