সংসদে মামুনুল হকের ‘মুতা বিয়ে’ নিয়ে বিতর্ক, স্পিকারের হস্তক্ষেপে এক্সপাঞ্জ

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের ব্যক্তিগত জীবন, পরকীয়া ও ‘মুতা বিয়ে’ প্রসঙ্গ টেনে আনেন ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য খোন্দকার আবু আশফাক। তবে সরকারি ও বিরোধী দলের আপত্তির মুখে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বক্তব্যটি কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ (বাদ দেওয়া) করার নির্দেশ দেন।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য খোন্দকার আবু আশফাক প্রসঙ্গটি সামনে আনেন।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক মানে একটা দেশ না, ইসলামী ব্যাংক একটি ব্যাংক।

সেটার জন্য (সংসদে আলোচনা) একঘণ্টা সময় নষ্ট করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৬৩ লাখ ২০ হাজার টাকা।
সিগারেট-মদের জন্য ওই পাশ (বিরোধী দল) থেকে বলা হয়েছে, এগুলো ট্রেজারি বেঞ্চ খায় বলে বাজেটে রাখা হয়েছে। আমি জানি না, আল্লাহ জানেন কার কী অভ্যাস আছে। আমি এতটুকু বলতে পারি, আপনারা বিগত দিনে শুনেছেন মুতা বিয়া। মুতা বিয়ে কী জিনিস আমি আপনার (স্পিকার) কাছে জানতে চাই।’ 

এরপর তিনি বলেন, ‘মাওলানা মামুনুল হক অনেক বড় বড় কথা বলছেন। বাজেট নিয়ে তিনি সরকারের পতন ঘটাবেন, অনেক কিছু ঘটাবেন। কিন্তু তিনি যে গাজীপুরে একটি নারীসহ ধরা পড়লেন, মুতা বিয়ের নামে, সেটা আসলে কী ছিল আমি জানি না। ছাত্রশিবির নেতা জিসান… এই ইতিহাসও আপনারা জানেন।’

বর্তমান সরকারের আমলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশংসা করে খোন্দকার আবু আশফাক বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক অবনতি হয়েছিল। অর্থনীতি তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছিল। বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র চার মাস পার হয়েছে। এই চার মাসের মধ্যে সরকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করেছে। বিরোধী দল থেকে এখনও বলা হয় যে, তাদের কথার বাইরে গেলে আন্দোলন করা হবে। কিন্তু বিএনপির জন্ম হয়েছে আন্দোলনের মাধ্যমে, বিএনপিকে আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই।’

এমপি আশফাকের এমন বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অপ্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় বক্তব্যে না আনাই ভালো। একজন রাজনৈতিক নেতার পরকীয়া সম্পর্কে আপনি মন্তব্য করেছেন। সাধারণত নিয়ম হলো, যার এখানে এসে জবাব দেওয়ার সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে অভিযোগ তোলা সংসদে সমীচীন নয়।’

স্পিকার আরও বলেন, ‘মুতা বিয়ে সম্পর্কে আমার কাছে কেন জানতে চাইলেন? আমাকে এসবের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মনে হয়? মুতা বিয়ে হলো সম্ভবত কেউ বিদেশে যায়, বিদেশে অবস্থানকালে টেম্পোরারি (অস্থায়ীভাবে) গেল, আগেরকার দিনে নিয়ম ছিল তিনি এক মাসের জন্য বিদেশে গেলে একটা সোকল্ড বিয়ে করতে পারতেন বা পার্টনার খুঁজে নিতে পারতেন। এটাই আমার ধারণা। তবে এগুলো নিয়ে সংসদে আলাপ-আলোচনা না করা ভালো। অপ্রাসঙ্গিক কিছু দয়া করে এখানে তুলবেন না।’

স্পিকারের রুলিংয়ের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলার জন্য দাঁড়িয়ে যান বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের। এ সময় স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় উপনেতা আপনি কী বলতে চান? আপনি কি মুতা বিয়ে নিয়ে এক্সপার্ট নাকি? বলেন।’

জবাবে সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘মুতা বিয়ের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞ না, তবে কনসেপ্টের বিষয়ে আমি জানি। স্পিকার আপনি রাইটলি বলেছেন, তিনি (মামুনুল হক) এখানে উপস্থিত নাই। তার ব্যাপারে এখানে আলোচনা তো সমীচীন না। মামুনুল হক সাহেবের ব্যাপারে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, এটা একেবারেই ভুল তথ্য। উনি কোনো মুতা বিয়ে করেন নাই। গাজীপুরে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে নাই। তাকে হ্যারাজ করা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জে। উনি বিয়ে করেছিলেন, এটা এস্টাবলিশড। বিয়ে করা জায়েজ। আমি চাইব যে আপনি এটি এক্সপাঞ্জ করুন। রেকর্ডে ভুল তথ্য থাকা উচিত হবে না।’

এরপর সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলামও দাঁড়িয়ে বলেন, ‘যা অসংসদীয় এবং সমীচীন নয়, তা কার্যবিবরণী হতে এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করছি।’

সবার বক্তব্য শোনার পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মাওলানা মামুনুল হকের বিষয়টি সংসদের কার্যবিবরণীতে আসার কোনো প্রয়োজন নেই। তাছাড়া এখানে এটা নিয়ে আমার বলার ইচ্ছা ছিল না। এখনও কিন্তু তিনি (মামুনুল হক) তার অবস্থান পরিষ্কার করেননি। একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের অন্ধকার অংশ এখানে আলোচিত হোক চাই না। যাক এটা নিয়ে আর আলাপ-আলোচনা করার প্রয়োজন নেই।’ এরপর তিনি বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দেন।

পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই, তিনি এ প্রসঙ্গটাকে থামানোর জন্য ইশারায় সংসদ সদস্যকে নির্দেশ দিয়েছেন।’ মুতা বিয়ের ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘একসময় মুতা বিয়ে করা যেত। এটা এখন হারাম হয়ে গেছে, নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। এখন করা যাবে না।’

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে একটি রিসোর্টের কক্ষে হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হককে এক নারীসহ অবরুদ্ধ করেন স্থানীয় ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ এলাকাবাসী। সেখানে পুলিশ গিয়ে মামুনুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তখন খবর পেয়ে হেফাজতের কর্মী-সমর্থক ও মাদ্রাসার ছাত্ররা ওই রিসোর্টে হামলা চালিয়ে তাকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন। ঘটনাটি সেসময় দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।

বাংলা নিউজ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top