বিরোধীদলকে প্রতিমন্ত্রী- ১৮ মাস যে আরামে ছিলেন, তা এখন হচ্ছে না

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধীদল গত ১৮ মাস বেশ আরামে ছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান। তিনি বলেছেন, সেই সুবিধা এখন পাওয়া যাচ্ছে না বলেই সমস্যা তৈরি হয়েছে। আজ রবিবার (২৬ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে জামায়াত-এনসিপি সমর্থিত সরকার আখ্যা দিয়ে বলেন, ওয়ান ইলেভেনে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল সেই সরকারটিকে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধয়ক সরকার বলা হত। আর গত ১৮ মাস যে সরকারটি ছিল, সেই সরকারটিকে আজকের যারা বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ আছেন, সেই জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি সমর্থিত সরকার হিসেবে সবাই অভিহিত করেছে।

তিনি বলেন, কথাটি বললাম এই কারণে যে গত ১৮ মাস যে আরামে ছিলেন, সেই আরাম এখন আর হচ্ছে না। এই কারণে অনেক সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। আমি প্রমাণ দিয়ে দেখাতে পারব। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন নেতার বক্তব্য আছে, সে একজনের সাথে গল্প করছে— বলছে যেভাবে আমরা কাটিয়েছি, মন চেয়েছে প্রধান উপদেষ্টার বাসায় ঢুকে গিয়েছি, মন চেয়েছে তার বেডরুমে ঢুকে গিয়েছি, মন চেয়েছে সচিবের রুমে ঢুকে গিয়েছি, এখন তো আর সেই সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। সমস্যাটা এই জন্যই।

এ সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণে শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা এবং তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশের গুরুত্ব তুলে ধরেন সড়ক প্রতিমন্ত্রী। বলেন, এখানে অন্ততপক্ষে তিনজন সংসদ সদস্য বক্তব্য দিয়েছেন— একজন বলেছেন ৮৪৪ জন শহীদ হয়েছেন, একজন বলেছেন ১০০০-এর ওপরে শহীদ হয়েছেন, একজন বলেছেন ১৪০০ শহীদ হয়েছেন। আমি যতটুকু পড়াশোনা করে দেখেছি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন হাসপাতালের সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে বলেছিল ১৪০০-র অধিক শহীদ হয়েছে এবং এটা জাতিসংঘের সংস্থাও বলার চেষ্টা করেছে। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় একটি গেজেট প্রকাশ করেছে, সেই গেজেটটিতে অতীতের গেজেট বাতিল করে ৮৪৪ জনের একটি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করছে। এখন সমস্যা কোন জায়গাটায়?

তিনি বলেন, বিরোধীদলের নেতাকে আমি খুবই পছন্দ করি। খুব সুন্দর কথা বলেন, আদবের সাথে কথা বলেন, উনার অঙ্গভঙ্গি, ভাষা ব্যবহারের যে বিষয়টি, সেটি অনুকরণ করার মত। আমার সাথে যতদিন দেখা হয়েছে লবিতে, আমি উনাকে সালাম দিয়েছি। আমাকে হয়তোবা উনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না, বাট আমি উনাকে খুবই পছন্দ করি। কিন্তু গত ১৪ এপ্রিল একটি অনুষ্ঠানে উনি বলেছেন; আমি তাকে দোষারোপ করছি না, আমি জাস্ট জানার জন্য— উনি বলেছেন প্রোগ্রামটিতে, আমি পত্রিকার রিপোর্ট দেখে বলছি, ১৪০০ শহীদের মধ্যে ১২০০ শহীদের বাসায় যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এখন সরকারি গেজেটে ৮৪৪, উনি ১৪০০’র মধ্যে ১২০০-র বাসায় কিভাবে গেলেন এটা তো আমি বুঝতে পারছি না।

তিনি বলেন, আমরা সংখ্যাটা জানতে চাই। উনি যদি যেয়ে থাকেন কোন আপত্তি নাই, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু আমরা প্রকৃত সংখ্যাটা জানতে চাই। জুলাই আন্দোলন হয়েছে এক বছর, দুই বছর হয় নাই। এখনই স্মৃতির বিস্মৃতিতে অনেক কিছু হারিয়ে যদি যায়, ১০-২০ বছর পরে এই ইতিহাস বিকৃতি কোথায় গিয়ে পৌঁছবে? মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে যে ধরনের একটি ব্যবসা, এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে যে ধরনের ব্যবসা আমরা দেখেছি গত ৫৪ বছর, আমরা চাই না এই প্রজন্মের যারা আছি— এই জুলাইকে কেন্দ্র করে নতুন করে ব্যবসা শুরু হোক। এই ব্যবসা বন্ধ করার জন্য প্রকৃত ইতিহাস, কতজন শহীদ হয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী— আমরা জানতে চাই।

প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বিরোধীদলীয় নেতার অপর এক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, আমরা তো রাজনৈতিক পরিচয়ের কথা বলেছি। উনি আরেকটি কথা বলেছেন, শহীদরা সবাই শিক্ষিত ছাত্র বা রাজনীতিবিদ নয়, তারা খেটে খাওয়া মানুষ, সাধারণ মানুষ। ভাল কথা। আমরা সবার অবদানকে স্বীকার করি। কিন্তু এই শহীদদের বড় অংশ তো রাজনীতিবিদদের আহ্বানে এখানে শরিক হয়েছেন। এই নেতৃত্বের অধীনে এই সংগ্রামে যারা শরিক হয়েছেন, তাদের অস্তিত্বকে যদি অস্বীকার করেন তাহলে শহীদদের উপরে এবং যারা আহত হয়েছেন তাদের উপরে আমার মনে হয় একটু অবিচার হয়ে যাবে।

এ সময় বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিরোধীদলের সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন রাজীব আহসান। তিনি বলেন, বাকস্বাধীনতা কিংবা মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবার আছে। এটার জন্যই আমরা লড়াই করেছিলাম, জীবন দিয়েছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে গত ১৭ বছর প্রত্যেকটি লড়াইয়ের অগ্রসৈনিক হিসেবে আমরা ছিলাম। আজকে বিরোধীদলের টেবিলে যারা বসে আছেন, এখানে সাধারণ সম্পাদক সাহেব নেই, অনেকের সাথেই এক বিছানায় ঘুমানোর সৌভাগ্য হয়েছে জেলখানায়। সেজন্য বলতে চাই, আমরা বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আপনি সরকারের সমালোচনা করবেন, সরকার ভুল করলে বলবেন, সমালোচনা করবেন, কার্টুন করবেন।

তিনি বলেন, কিন্তু আমার নেত্রী মারা গেছেন, তাকে উদ্দেশ্য করে যদি আপনাদের কর্মীরা কোন অশালীন বক্তব্য দেয়, আমার প্রধানমন্ত্রী আছেন, তার অবশ্যই সমালোচনা করা যাবে— সেটা নিয়মের মধ্যে করেন। ব্যক্তিগতভাবে, পারিবারিকভাবে আমাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে যদি এইভাবে কুৎসা রটনা করা হয়, সেটি কিন্তু আমাদের জন্য দুঃখজনক। আপনারা এখানে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলবেন, আমরাও শুনতে চাই, আমরাও কাজ করতে চাই আপনাদের সাথে। কিন্তু যারা কুৎসা রটনা করেছেন, আমরা তো দেখলাম আপনারা তাদেরকে পুরস্কৃত করেছেন। যিনি কুৎসা রটনা করেছেন, অশ্লীল মন্তব্য করেছেন, তার পরিবারের সদস্যকে আপনারা সংসদ সদস্য করেছেন। কী প্রমাণ করতে চান আপনারা? কী দেখাতে চান আপনারা? আমরা এখনো বলব একসাথে কাজ করতে চাই, আপনাদের সাথে কাজ করতে চাই। যে স্বপ্ন নিয়ে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে, সেই অভ্যুত্থানের চেতনাকে বুকে ধারণ করে আপনাদের সাথে সরকারি দল এবং বিরোধী দল একসাথে কাজ করতে চাই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top