
ডেস্ক রিপোর্ট
কুয়াশাচ্ছন্ন ডিসেম্বরের ভোরে আচমকাই যেন থমকে গেল বাংলাদেশ। রাজধানীর আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল এক অপূরণীয় শূন্যতার হাহাকারে। যে নামটি গত চার দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির অলিগলি থেকে রাজপথ—সর্বত্রই ছিল প্রবল প্রতাপে উচ্চারিত, সেই নাম আজ ইতিহাসের পাতায়। আপসহীন নেতৃত্ব, হার না মানা সংগ্রাম আর কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।
গতকাল মঙ্গলবার ভোরে তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শোকের কালো ছায়া নেমে আসে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। দলমত নির্বিশেষে মানুষ থমকে দাঁড়ায়। রাজনীতির মাঠের ভেদাভেদ, তর্কের কোলাহল ভুলে এই শোক ছুঁয়ে গেছে দেশের সংস্কৃতি ও বিনোদন অঙ্গনকেও।
রাজনীতি এবং সংস্কৃতি—রাষ্ট্রের এ দুই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে তারকারাও আজ শোকে মুহ্যমান। ঢাকাই চলচ্চিত্রের সুপারস্টার, বরেণ্য সংগীতশিল্পী থেকে শুরু করে নবীন নির্মাতা—সবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন। তাদের লেখনীতে উঠে এসেছে নব্বইয়ের দশকের স্মৃতি, নারী জাগরণের ইতিহাস এবং একজন ‘অভিভাবক’ হারানোর বেদনা।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণকে তারকারা শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু হিসেবে দেখছেন না; তারা দেখছেন একটি দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে। যিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ঢাকাই সিনেমার শীর্ষ নায়ক ও সুপারস্টার শাকিব খান গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়েছেন সদ্য প্রয়াত এ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি। শাকিব খান লিখেছেন, ‘শোক ও বিনম্র শ্রদ্ধা। বাংলাদেশের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মহান আল্লাহতায়ালা যেন তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকামে অধিষ্ঠিত করেন। আমিন। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’
অন্যদিকে, ঢালিউডের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক আরিফিন শুভ তার শোকবার্তায় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক সত্যটিই তুলে ধরেছেন। শুভ তার ভেরিফায়েড পেজে লিখেছেন, ‘দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়, দীর্ঘ এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। আল্লাহ তাকে উত্তম মর্যাদা দান করুন।’ শুভর এ সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর বার্তাটি যেন কোটি মানুষের মনের কথাই প্রতিধ্বনিত করেছে।
ব্যান্ড সংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি জেমসও শোক প্রকাশে কার্পণ্য করেননি। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে তিনিও সম্মান জানিয়েছেন দেশের এ শীর্ষ নেত্রীকে। জেমস লিখেছেন, ‘শোক ও বিনম্র শ্রদ্ধা। বাংলাদেশের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি।’
দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান খালেদা জিয়ার বিদায়কে দেখছেন গণতন্ত্রের এক বড় চরিত্রের প্রস্থান হিসেবে। জয়ার লেখনীতে উঠে এসেছে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বেগম জিয়ার ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা। জয়া লিখেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া বড় দুঃসময়ে বিদায় নিলেন। সামনে নির্বাচন আর গণতন্ত্রের জন্য মানুষ অপেক্ষা করছে। তাঁর উপস্থিতির মূল্যই ছিল অসামান্য। সামরিক-শাসনবিরোধী এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বেগম জিয়া ছিলেন প্রধান একটি চরিত্র, সাহসে ও নেতৃত্বে উজ্জ্বল। তাঁর সঙ্গে দেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি অধ্যায় শেষ হলো। তাঁর আত্মা চির প্রশান্তি লাভ করুক।’
নব্বই দশকে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে খালেদা জিয়া ছিলেন এক বিশেষ অনুভূতির নাম। সাদা শাড়িতে আবৃত, অভিজাত এবং ধীরস্থির এক নারীমূর্তির দেশ পরিচালনার দৃশ্যটি গেঁথে আছে অনেকের মনে। অভিনেত্রী ও নির্মাতা মেহের আফরোজ শাওন সেই নস্টালজিয়া থেকেই স্মৃতিচারণ করেছেন। শাওন লিখেছেন, ‘নব্বই দশকে বেড়ে ওঠা আমাদের প্রজন্ম আপনাকে মনে রাখবে ভালো-মন্দ নানা কারণে। তবে আমি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের শাসনামলের সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার কথা মনে রাখতে চাই। বাংলাদেশের প্রথম নারী সরকার প্রধান বেগম খালেদা জিয়া, আপনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।’
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বেগম খালেদা জিয়া। তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম নারী সরকারপ্রধান। এ বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের শোকবার্তায়।
চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এই চিরবিদায় মহাকালের সাক্ষী হয়ে রইল। একজন মহীয়সী নারীর প্রস্থান এ দেশের মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিনম্র শ্রদ্ধা।’
একই সুরে শোক জানিয়েছেন চিত্রনায়িকা শবনম বুবলী। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর বিদেহী আত্মা চিরশান্তিতে থাকুক। আমিন।’
চিত্রনায়িকা নুসরাত ফারিয়া শোক প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।’ জনপ্রিয় অভিনেত্রী তানজিকা আমীন লিখেছেন, ‘একজন অবিচল নেত্রী, মেয়েদের শিক্ষার প্রসারক, আপনি চির শান্তিতে বিশ্রাম নিন।’
এ ছাড়া অভিনেত্রী রাফিয়াথ রশিদ মিথিলা এবং আশনা হাবিব ভাবনাও খালেদা জিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরবময় স্মৃতি স্মরণ করে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন।
জনপ্রিয় নির্মাতা আশফাক নিপুণ বেগম জিয়ার ধৈর্য ও আভিজাত্যের প্রশংসা করে লিখেছেন, ‘আল্লাহ আপনাকে জান্নাত নসিব করুন। আপনি ছিলেন ধৈর্য, আভিজাত্য এবং হার না মানার এক অনন্য প্রতীক; এমনকি প্রতিপক্ষের অমানবিক আচরণের মুখেও আপনি দমে যাননি। এই জাতি আপনাকে সবসময় গর্বের সাথে মনে রাখবে।’
আরেক জনপ্রিয় নির্মাতা মাবরুর রশীদ বান্নাহ লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীকের বিদায়। বিদায় আপসহীন নেত্রী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।’
প্রিয় নেত্রীর বিদায়ে ব্যথিত হয়ে ফেসবুকে আরো পোস্ট করেছেন—জিয়াউল হক পলাশ, সাদিয়া জাহান প্রভা, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, জাহের আলভী, তমা মির্জা, আজমেরী হক বাঁধন, সংগীতশিল্পী কনক চাঁপা, সিয়াম আহমেদ, পূজা চেরি, আরশ খান, রুকাইয়া জাহান চমক ও পিয়া জান্নাতুলসহ অনেকে।




