পিতামাতার প্রতি সদাচার

শায়খ ইবনুল কালাম

পিতামাতার প্রতি সদাচার সন্তানের আবশ্যিক কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। শরীয়তে এর প্রতি অনেক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল সা. এক হাদিসে এই পর্যন্ত বলেছেন যে পিতামাতা সন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকেন। পিতামাতা অসন্তুষ্ট হলে আল্লাহ তায়ালাও গোস্বা হয়ে যান। (সুনানে বাইহাকি, হাদিস : ৭৪৪৫) সেজন্য প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতামাতার প্রতি সদাচারী হওয়া চাই।

পিতামাতার প্রতি অনুগত হওয়া, তাদের সেবা যত্ন করা অনেক বড় ইবাদত। আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম এটি। একবার এক ব্যক্তি হজরত ইবনে আব্বাস রা. এর কাছে এসে বললেন, হে ইবনে আব্বাস, আমি এক নারীকে পছন্দ করে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু সে তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে আরেকজন তাকে প্রস্তাব দেয়। সাথে সাথে সে প্রস্তাবটি লুফে নেয়। এতে আমার আত্মসম্মানবোধে লাগে। তখন আমি তাকে হত্যা করে ফেলি। এখন আমি কি আল্লাহ তায়ালার কাছে তাওবা করলে ক্ষমা পাব? তখন ইবনে আব্বাস রা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন? লোকটি বললো, না। আমার মা বেঁচে নেই। তখন ইবনে আব্বাস রা. বললেন, আচ্ছা, তাহলে আর কী করার। আল্লাহ তায়ালার কাছে তাওবা করো। আর নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের চেষ্টা করো।

হাদিসের রাবি আতা বিন ইয়াসার বলেন, লোকটি চলে গেলে আমি ইবনে আব্বাস রা. কে জিজ্ঞেস করলেন, হে ইবনে আব্বাস, তার মা জীবিত আছেন কিনা, এই প্রশ্নের কারণ কী? তখন তিনি বললেন, মায়ের সেবা করা ও মায়ের প্রতি সদাচারী হওয়া এমন একটি আমল, আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের ক্ষেত্রে এর বিকল্প নেই। (আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৫)

মাতাপিতার সেবা-যত্ন করা, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা অনেক বড় আমল। এটি আল্লাহ তায়ালার পছন্দনীয় আমলের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। হাদিসেই বিষয়টি বিবৃত হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, একবার আমি আল্লাহর রাসূল সা.কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তায়ালা নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল কোনটি? রাসূল সা. বললেন, সময়মতো নামাজ পড়া। আমি পুনরায় জানতে চাইলাম, এরপর কোনটি? নবীজি সা. বললেন, পিতামাতার প্রতি সদাচারী হওয়া। সহিহ বুখারী, হাদিস : ৫২৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮৫

পিতামাতা হলো সন্তানের দুই জান্নাত। সেজন্য পিতামাতাকে কোনো ধরনের কষ্টও দেয়া যাবে না। এমনকি তাদের কোনো কাজে বিরক্ত হয়ে উফ পর্যন্ত করা ঠিক নয়। সর্বদা সুন্দরভাবে মিষ্টি ভাষায় কথা বলতে হবে। ছেলে মানুষি করলেও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। এটিই আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ। এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে তাকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না। পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। পিতামাতার কোনো একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের উফ পর্যন্ত বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না। বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো। (সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত : ২৩)

কখনো যদি এমন হয়, বাবা-মা তাদের অবুঝের কারণে কুফুরির উপর জবরদস্তি করে, তাহলেও বাবা-মাকে কোনো কষ্ট দেয়া যাবে না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা যাবে না। বরং এমন পন্থায় তাদের কথা ফিরিয়ে দিতে হবে, যেন তারা নিজেদেরকে অবমানিতও বোধ না করেন। তাদেরকে নম্র ভাষায় বুঝিয়ে বলতে হবে যে আমি আপনাদের কথা মানতে অপারগ। শুধু এতটুকুই নয়, বরং সাধারণভাবে অন্য সকল ক্ষেত্রেই তাদের সাথে সদাচরণ করতে হবে। খেদমতও চালিয়ে যেতে হবে। অসুস্থ হলে সেবা যত্ন করতে হবে। প্রয়োজনে আর্থিক সহযোগিতাও দিতে হবে। এ বিষয়ে কুরআনে বলা হয়েছে, তারা যদি এমন কাউকে (প্রভুত্বে) আমার সমকক্ষ সাব্যস্ত করার জন্য তোমাকে চাপ দেয়, যে সম্পর্কে তাদের কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের কথা মানবে না। বাকি দুনিয়ায় তাদের সাথে সদ্ভাবে থাকে আর এমন ব্যক্তির পথ অবলম্বন করো, যে একান্তভাবে আমারমুখী হয়েছে। সূরা লুকমান, আয়াত : ১৫

হাদিসে এসেছে, পিতামাতার পক্ষ থেকে যদি কখনো জুলুমও হয়ে যায়, তবুও তাদেরকে অসন্তুষ্ট করবে না। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে মুসলমানে পিতামাতা আছে আর সে সকালে তাদের কাছে গিয়ে কুশল বিনিময় করে, তার জন্য আল্লাহ তায়ালা বেহেশতের দুটি দরজা খুলে দেন। যদি তাদের একজন বেঁচে থাকে, তাহলে একটি দরজা খুলে দেন। যদি সে তাদের দুইজনের কাউকে অসন্তুষ্ট করে, তবে যতক্ষণ না সে তাকে সন্তুষ্ট করে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যান। এ সময় ইবনে আব্বাস রা.কে জিজ্ঞেস করা হলো যে যদি তারা জুলুম করে, তাহলেও কি এমন নির্দেশ? তখন ইবনে আব্বাস রা. বলেন, হাঁ, জুলুম করলেও একই কথা। (আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৭)

সেজন্য আমাদেরকে পিতামাতার প্রতি সদাচারী হতে হবে। তাদের খেদমত করে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে তাওফিক দান করেন। আমিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top