ভারতীয় পশুর প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কড়াকড়ি

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে ভারতীয় পশুর অবৈধ ‘পুশ-ইন’ বা বাংলাদেশে পাচার ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। সীমান্তজুড়ে বাড়ানো হচ্ছে নজরদারি। সীমান্তবর্তী এলাকায় পশুর হাট বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে কোরবানির পশু আমদানি না করার নীতিগত সিদ্ধান্তও রয়েছে সরকারের।

সরকারি হিসাবে দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা উদ্বৃত্ত হলেও রাজধানী ও চট্টগ্রামে রয়েছে ঘাটতি। এ দুটি অঞ্চলে চাহিদার তুলনায় সাড়ে সাত লাখের বেশি পশুর ঘাটতি রয়েছে বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ-১ শাখার যুগ্ম সচিব ড. শাহীন আরা বেগম আমার দেশকে বলেন, দেশে কোরবানির পশুর ঘাটতি নেই বরং উদ্বৃত্ত আছে। কিন্তু ঈদ সামনে রেখে ভারত থেকে চোরাইপথে প্রচুর পশু আসেÑএটাই সমস্যা। এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে কোরবানির জন্য দেশে প্রস্তুত পশুর সংখ্যা এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে এক কোটি এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪টি। সে হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকছে প্রায় ২২ লাখ পশু। গত বছর দেশে চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ২০ লাখের বেশি পশু। ওই বছর ভারত থেকে বিপুলসংখ্যক পশুর পুশ-ইনের ফলে দাম কমে যায়। চাহিদার অতিরিক্ত পশু বাজারে আসায় দেশি খামারিদের অনেক পশু অবিক্রীত ছিল।

এদিকে হঠাৎ বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলে গো-খাদ্যের সংকটে খামারিরা সস্তায় গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। গো-খাদ্য সংকটের কারণে তারা এ পথ বেছে নিয়েছেন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর গ্রামের সততা এগ্রো ফার্মের মালিক দিলশাদ মিয়া এ বিষয়টি স্বীকার করেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, বন্যার কারণে খড় পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য জায়গা থেকে বিকল্প খাবার সংগ্রহ করে পশুদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তারা। এর ফলে লালন-পালন খরচ দ্বিগুণ হচ্ছে। এছাড়া এ সময় নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে গবাদিপশু। তিনি আরো বলেন, খরচ পুষিয়ে নিতে প্রথমদিকে কিছু বিক্রি করেছিলাম। বর্তমানে খামারে ২৯টি পশু রয়েছে।

এদিকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দাবি করেন, গোখাদ্য সংকটের কারণে প্রান্তিক খামারিরা আগাম পশু বিক্রি করছেনÑএমন অভিযোগের পক্ষে তারা নির্দিষ্ট তথ্য পাননি। এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু আমার দেশকে বলেন, এ ধরনের খবরের কোনো সত্যতা নেই। কারণ গো-খাদ্যের কোনো সংকট নেই। তাই প্রান্তিক খামারিরা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম দামে পশু বিক্রি করছেনÑএটা ঠিক নয়। প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, গো-খাদ্যের অভাব দেখা দেবে তখন, যখন একনাগাড়ে বৃষ্টি হবে। এমন ঘটনা চলতি বছরে ঘটেনি।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে দেশে কোরবানি হয়েছিল এক কোটি ছয় লাখের বেশি পশু। করোনার সময় ২০২০ সালে তা নেমে আসে প্রায় ৯৪ লাখে। ২০২১ সালেও সংখ্যা কম ছিল। এরপর বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও গরু কোরবানির হার আগের পর্যায়ে ফেরেনি। অপর তথ্যে দেখে গেছে, ২০১৮-২০ সময়ে গড়ে ৫৪ লাখের বেশি গরু ও মহিষ কোরবানি হলেও ২০২২-২৪ সময়ে তা কমে গড়ে প্রায় ৪৭ লাখে নেমেছে। অর্থাৎ, গরু কোরবানিতে প্রায় ১৪ শতাংশ পতন ঘটেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী এবার সবচেয়ে বেশি কোরবানিযোগ্য পশুর প্রাপ্যতা রাজশাহী বিভাগে। বিভাগটিতে ৪৩ লাখ পাঁচ হাজার ৬২৮টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর বিপরীতে চাহিদা ২৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯টি। অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত থাকছে প্রায় ১৮ লাখ ৭০ হাজার পশু। রংপুর বিভাগে প্রাপ্যতা ২০ লাখ ২৩ হাজার ৬৭টি; চাহিদা ১৪ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৭টি। উদ্বৃত্ত পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ৪১০টি। ময়মনসিংহ বিভাগে প্রাপ্যতা পাঁচ লাখ ৬১ হাজার ৬৩৯টি; চাহিদা চার লাখ ৪৪ হাজার ৫৮৮টি। উদ্বৃত্ত এক লাখ ১৭ হাজার ৫১টি। খুলনা বিভাগে ১৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮০৯ পশুর বিপরীতে চাহিদা ১০ লাখ ৭৯ হাজার ৪৪৯টি। উদ্বৃত্ত তিন লাখ ৬৭ হাজার ৩৬০টি।

অন্যদিকে ঘাটতিতে রয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ। ঢাকায় সম্ভাব্য চাহিদা ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি হলেও প্রাপ্যতা দেখানো হয়েছে ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি। অর্থাৎ, ঘাটতি সাত লাখ ১৪ হাজার ৯২৭টি। চট্টগ্রামে প্রায় ৫০ হাজার পশুর ঘাটতির হিসাব দেওয়া হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী এবার মাঠ পর্যায়ে ৯ লাখ ১৬ হাজার ১৮৭ খামারি কোরবানির পশু প্রস্তুত করেছেন। এর মধ্যে গরু-মহিষ রয়েছে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির পশু পাঁচ হাজার ৬৫৫টি।

প্রাণিসম্পদ খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক দশকে গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এখন প্রায় প্রতিবছরই সরকার দাবি করছে, দেশি পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা পূরণ সম্ভব।

কিন্তু খামারিদের অভিযোগ, উৎপাদন বাড়লেও তারা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। বিশেষ করে যেসব বছর বাজারে ক্রেতা কম থাকে, সেসব বছরে বড়সংখ্যক পশু অবিক্রীত থেকে যায়। ২০২৫ সালে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি হিসাবেই চাহিদার তুলনায় সাড়ে তিন লাখ কম পশু কোরবানি হয়েছে এবং বহু পশু অবিক্রীত ছিল।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি উৎপাদন হিসাব মূলত প্রশাসনিক তথ্যনির্ভর। কিন্তু বাস্তবে কত পশু বাজারে ওঠে, কত বিক্রি হয় এবং কত আবার খামারে ফেরত যায়—সেই তথ্যের পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেস নেই।

কুষ্টিয়ার হরিপুর গ্রামের জুয়েল এগ্রো ফার্মের মালিক বিএম মুকুল হোসেন আমার দেশকে বলেন, পত্রপত্রিকার খবর থেকে জানতে পারি চাহিদার তুলনায় দেশে পশুর সংখ্যা উদ্বৃত্ত। সরকারি হিসাব আমি বুঝি না। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা কারণে গত বছরের তুলনায় তার পশুর সংখ্যা অর্ধেকের কম। গত বছর যেখানে ৩৭টি ছিল, এবার তা কমে ১৫টিতে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া তিনি আরো দাবি করেন, তার আশপাশের অনেক এলাকার খামার নানা সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশি খামারিদের স্বার্থরক্ষায় সীমান্তবর্তী এলাকায় পশুর হাট না বসানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অতীতে এসব হাটের মাধ্যমে বিদেশি পশু প্রবেশ করায় দেশি খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবারও অনলাইনে পশু বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে কোনো খাজনা বা ফি নেওয়া হবে না। পাশাপাশি কোরবানির চামড়া সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য পেশাদার ও অপেশাদার কসাইদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে চামড়া নষ্ট না হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top