কুরআন-সুন্নাহ : শরীয়তের অবিচ্ছেদ্য দুই অঙ্গ

মাহমুদ বিন ইমরান

মুমিন ও মুসলিম হওয়ার জন্য একটি প্রধান ও মৌলিক শর্ত হল, খাতামুন্নাবিয়্যীন সায়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান আনা। এর জন্য জরুরি হল, তাঁর থেকে প্রাপ্ত সমস্ত বিষয়কে সত্য বলে বিশ্বাস করা। চাই সেটা কুরআন হোক কিংবা কুরআনের বাইরে হাদীস হোক। কুরআনে আল্লাহ তাআলা নবীজীর প্রতি নিঃশর্তভাবে ঈমান আনার আদেশ করেছেন। তাঁর থেকে প্রাপ্ত সকল আদেশ-নিষেধ ও হালাল-হারামের প্রতি ঈমান আনার ও তাঁর অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন। নবীর কথা কুরআনে থাকলে মানবে আর কুরআনে না থাকলে মানবে না- এমন কোনো কথা আল্লাহ তাআলা বলেননি; বলার প্রশ্নই ওঠে না। নবীজীর প্রতি ঈমান ও তাঁর অনুসরণের বিষয়ে আল্লাহ তাআলার আদেশ একদম স্পষ্ট। এখানে কোনো ধরনের অপব্যাখ্যার সুযোগ নেই। সূরা আ‘রাফে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট বলেছেন-

یَاْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوْفِ وَ یَنْهٰىهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَ یُحِلُّ لَهُمُ الطَّیِّبٰتِ وَ یُحَرِّمُ عَلَیْهِمُ الْخَبٰٓىِٕثَ وَ یَضَعُ عَنْهُمْ اِصْرَهُمْ وَ الْاَغْلٰلَ الَّتِیْ كَانَتْ عَلَیْهِمْ، فَالَّذِیْنَ اٰمَنُوْا بِهٖ وَ عَزَّرُوْهُ وَ نَصَرُوْهُ وَ اتَّبَعُوا النُّوْرَ الَّذِیْۤ اُنْزِلَ مَعَهٗۤ اُولٰٓىِٕكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ.

তিনি (রাসূল) তাদের সৎ কাজের আদেশ করবেন ও মন্দকাজে নিষেধ করবেন এবং তাদের জন্য উৎকৃষ্ট বস্তু হালাল করবেন ও নিকৃষ্ট বস্তু হারাম করবেন। আর তাদের থেকে ভার ও গলার বেড়ি নামাবেন, যা তাদের ওপর চাপানো ছিল। সুতরাং যারা তাঁর (অর্থাৎ রাসূলের) প্রতি ঈমান আনবে, তাঁকে সম্মান করবে, তাঁর সাহায্য করবে এবং তাঁর সঙ্গে যে নূর অবতীর্ণ করা হয়েছে, তার অনুসরণ করবে, তারাই হবে সফলকাম। -সূরা আ‘রাফ (৭) : ১৫৭

অতএব কুরআনে আল্লাহর হারামকৃত বস্তু যেমন হারাম, তেমনি হাদীসে নবীজীর হারামকৃত বস্তুও হারাম। কুফর থেকে বাঁচতে উভয়ের হারামকৃত বস্তুকেই হারাম মনে করতে হবে; কোনো রকমের পার্থক্য করা যাবে না। পার্থক্য করলে ঈমান থাকবে না। কাফেরদের পরিচয় বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা উভয় হারামকে একইসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, কোনো ধরনের পার্থক্য না করেই। সূরা তাওবায় ইরশাদ হয়েছে-

قَاتِلُوا الَّذِیْنَ لَا یُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَ لَا بِالْیَوْمِ الْاٰخِرِ وَ لَا یُحَرِّمُوْنَ مَا حَرَّمَ اللهُ وَ رَسُوْلُهٗ وَ لَا یَدِیْنُوْنَ دِیْنَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ حَتّٰی یُعْطُوا الْجِزْیَةَ عَنْ یَّدٍ وَّ هُمْ صٰغِرُوْنَ.

তোমরা ওসব কিতাবীর সঙ্গে যুদ্ধ কর, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না ও পরকালেও না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন, তাকে হারাম মনে করে না এবং সত্য দ্বীনকে নিজের দ্বীন বলে স্বীকার করে না। (তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর) যতক্ষণ না তারা হেয় হয়ে নিজ হাতে জিযিয়া আদায় করে। -সূরা তাওবা (৯) : ২৯

যারা কুরআন মানে, কিন্তু হাদীস মানে না- তাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে সতর্ক করে গেছেন। সাহাবী মিকদাম ইবনে মা‘দীকারিব রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

أَلاَ هَلْ عَسَى رَجُلٌ يَبْلُغُهُ الحَدِيثُ عَنِّي وَهُوَ مُتَّكِئٌ عَلَى أَرِيكَتِه، فَيَقُولُ: بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ كِتَابُ اللهِ، فَمَا وَجَدْنَا فِيهِ حَلاَلاً اسْتَحْلَلْنَاهُ. وَمَا وَجَدْنَا فِيهِ حَرَامًا حَرَّمْنَاهُ، وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ اللهِ كَمَا حَرَّمَ اللهُ.

শুনে রাখ, হয়তো এমন ব্যক্তির উদ্ভব ঘটবে, সে তার সুসজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসে থাকবে। তখন তার কাছে আমার কোনো হাদীস পৌঁছলে সে বলে উঠবে, আমাদের মাঝে ও তোমাদের মাঝে তো আল্লাহর কিতাবই আছে। এতে আমরা যা হালাল পাব, তা হালাল হিসেবে গ্রহণ করব আর যা হারাম পাব, তা হারাম মনে করব। অথচ (প্রকৃত অবস্থা এই যে,) রাসূল যা হারাম করেছেন তা আল্লাহর হারামকৃত বস্তুর মতোই হারাম। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৬৬৪

আরেক বর্ণনায় আছে-

أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ، وَمِثْلَه مَعَه، أَلَا يُوشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانُ عَلَى أَرِيكَتِه يَقُولُ: عَلَيْكُمْ بِهذَا الْقُرْآنِ، فَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَلَالٍ فَأَحِلُّوهُ، وَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ.

শুনে রাখ, নিশ্চয় আমাকে কিতাব ও তার সঙ্গে তার সমান আরো দেওয়া হয়েছে। শুনে রাখ, হয়ত এমন লোকের উদ্ভব ঘটবে, যে তৃপ্ত হয়ে তার সুসজ্জিত আসনে ঠেস দিয়ে বসে থাকবে। সে বলবে, তোমরা এ কুরআনকে গ্রহণ কর। এর মধ্যে যা হালাল পাবে, তা হালাল হিসেবে গ্রহণ কর আর যা হারাম পাবে তা হারাম হিসেবে গ্রহণ কর। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৬০৪

সেজন্য নবীর সাহাবীগণ কখনো কুরআনের বিধান আর হাদীসের বিধানের মধ্যে পার্থক্য করেননি। তাঁরা শুধু দেখতেন, বিষয়টা নবীজী বলেছেন কি না? বিষয়টা তাঁর থেকে প্রমাণিত কি না? তাঁরা কুরআনের বিধান এবং নবীর মুখে শোনা হাদীসের বিধান উভয়টাকেই একপর্যায়ের মনে করতেন। কারণ কুরআনের বিধান আর হাদীসের বিধান উভয়টাই আমরা নবীজী থেকে পেয়েছি। বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে একজন জিজ্ঞেস করল, আবাসে থাকাকালীন নামায এবং শত্রু ভীতিকালীন নামাযের বিবরণ তো আমরা কুরআনে পাই। তবে সফরকালীন নামাযের বিবরণ তো কুরআনে পাই না? তখন আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বললেন-

إِنَّ اللهَ بَعَثَ إِلَيْنَا مُحَمَّدًا صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ وَلاَ نَعْلَمُ شَيْئًا،فَإِنَّمَا نَفْعَلُ كَمَا رَأَيْنَا مُحَمَّدًا صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ يَفْعَلُ.

আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন এ অবস্থায় যে, আমরা কিছুই জানতাম না। তাই আমরা তেমনই করি, যেমন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে করতে দেখেছি। -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১০৬৬; সুনানে নাসায়ী ৩/১১৭; মুসতাদরাকে হাকেম ১/২৫৮

দ্বীন ও শরীয়ত মানার এটাই একমাত্র সঠিক ও স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতি। সকল সাহাবায়ে কেরাম এভাবেই দ্বীন পালন করতেন। সকল যুগের সকল মুমিন এভাবেই দ্বীন পালন করে আসছেন। বর্তমানে যারা কুরআন অনুসরণের নাম ব্যবহার করে মানুষকে নবীজীর হাদীস থেকে বিমুখ করার চেষ্টা করছে, ওরা আসলে মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ তারা মুমিনদের পথ ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাস্তা গ্রহণ করেছে। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করছেন-

وَ مَنْ یُّشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْۢ بَعْدِ مَا تَبَیَّنَ لَهُ الْهُدٰی وَ یَتَّبِعْ غَیْرَ سَبِیْلِ الْمُؤْمِنِیْنَ نُوَلِّهٖ مَا تَوَلّٰی وَ نُصْلِهٖ جَهَنَّمَ، وَ سَآءَتْ مَصِیْرًا.

আর যে ব্যক্তি তার সামনে হেদায়েত স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং ‘সাবীলুল মুমিনীন’ তথা মুমিনদের পথ ছেড়ে অন্য কোনো পথ অনুসরণ করবে, আমি তাকে সে পথেই ছেড়ে দেব, যে পথ সে অবলম্বন করেছে। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব, যা অতি মন্দ ঠিকানা। -সূরা নিসা (৪) : ১১৫

 

একটি আয়াতের অপব্যাখ্যা : প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি তার মতের পক্ষে কুরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করেছেন। সব হাদীস অস্বীকারকারীই তাদের অস্বীকারের দলীল হিসেবে এ আয়াতটিকে ব্যবহার করে থাকেন। সূরা নাহ্লের ৮৯ নং আয়াত। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ نَزَّلْنَا عَلَیْكَ الْكِتٰبَ تِبْیَانًا لِّكُلِّ شَیْءٍ وَّ هُدًی وَّ رَحْمَةً وَّ بُشْرٰی لِلْمُسْلِمِیْنَ.

আর আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি- যা প্রতিটি বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনাকারী। এটি মুসলিমদের জন্য হেদায়েত, রহমত ও সুসংবাদ। -সূরা নাহ্ল (১৬) : ৮৯

হাদীস অস্বীকারকারীরা এ আয়াতের অনিবার্য অর্থ এটাই ধরে নিয়েছে যে, এর মানে রাসূলের হাদীস মানতে হবে না! রাসূল কুরআনের ব্যাখ্যায় কী বললেন- সেটা আর জানতে হবে না! আমরা নিজেরা কুরআন (বা কুরআনের অনুবাদ) পড়ব এবং নিজেরাই কুরআন বুঝে নেব; এটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। (নাউযু বিল্লাহ)

অথচ এমন কোনো কথা আয়াতে বলা হয়নি। এটা সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের বানানো কথা। এটাকে তারা কুরআনের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।

কুরআন প্রতিটি বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনাকারী- এ বাক্যের কী অর্থ? এর স্বাভাবিক অর্থ তো এটাই যে, কুরআন যেহেতু হেদায়েত-গ্রন্থ সেহেতু মানবজাতির হেদায়েতের জন্য যা যা নির্দেশনা দরকার, সমস্ত নির্দেশনা কুরআনে বিদ্যমান। সমস্ত নির্দেশনা আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। কোনো অস্পষ্টতা রাখেননি। অতএব এখন আমাদের জানতে হবে, কুরআনে আল্লাহ তাআলা কী কী নির্দেশনা দিয়েছেন?

এখানে দুইটি নির্দেশনা উল্লেখ করা হল-

ক. কুরআনে আল্লাহ তাআলা যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন সেগুলোর অন্যতম হল- রাসূলের প্রতি ঈমান আনা এবং রাসূলের অনুসরণ করা। ত্রিশেরও অধিকবার এ আদেশ করেছেন। বিভিন্নভাবে করেছেন। রাসূলের অনুসরণে কাফেরদের যত আপত্তি, সমস্ত আপত্তি খণ্ডন করেছেন। রাসূলের প্রতি কাফেরদের যত অপবাদ, সমস্ত অপবাদ দূর করেছেন। কারণ আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রাসূলের প্রতি ঈমান আনা এবং রাসূলের অনুসরণ করা। রাসূলের প্রতি ঈমান আনা না হলে কুরআনের প্রতিও ঈমান আনা হবে না; অন্য কোনো কিছুর প্রতিও ঈমান আনা হবে না। সেজন্য কুরআন কারীমে এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত জোর দিয়েছেন। এমনকি একথাও বলে দিয়েছেন-

مَنْ یُّطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ اَطَاعَ اللهَ، وَ مَنْ تَوَلّٰی فَمَاۤ اَرْسَلْنٰكَ عَلَیْهِمْ حَفِیْظًا.

যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে মুখ ফিরিয়ে নিল, তো আমি আপনাকে তাদের পর্যবেক্ষকরূপে পাঠাইনি। -সূরা নিসা (৪) : ৮০

সেইসঙ্গে নিজের মহব্বত ও মাগফিরাতকে রাসূলের আনুগত্যের সঙ্গে শর্তযুক্ত করে দিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন-

قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِیْ یُحْبِبْكُمُ اللهُ وَ یَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ، وَ اللهُ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ.

(হে নবী!) আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবেসে থাক, তবে আমার অনুসরণ কর; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ৩১

খ. আল্লাহ তাআলা মানুষের হেদায়েতের জন্য এ কিতাব নাযিল করেছেন। তাই এটা অত্যন্ত জরুরি ছিল যে, মানুষ যেন এ কিতাবের নির্দেশনা ও বার্তাগুলো সঠিক ও নির্ভুলভাবে গ্রহণ করতে পারে। তারা যেন কিতাব বুঝতে গিয়ে কোনো ভুল বা গোমরাহীর শিকার না হয়। তাই আল্লাহ তাআলা রাসূলের ওপর কিতাব নাযিলের পাশাপাশি তাঁকে কিতাবের ব্যাখ্যাও শিখিয়ে দিলেন। সূরা কিয়ামায় নবীজীকে বললেন-

لَا تُحَرِّكْ بِهٖ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهٖ، اِنَّ عَلَیْنَا جَمْعَهٗ وَ قُرْاٰنَهٗ، فَاِذَا قَرَاْنٰهُ فَاتَّبِعْ قُرْاٰنَهٗ، ثُمَّ اِنَّ عَلَیْنَا بَیَانَهٗ.

(হে নবী!) আপনি কুরআন তাড়াতাড়ি মুখস্থ করার জন্য এর সাথে আপনার জিহ্বা নাড়াবেন না। নিশ্চয়ই একে (আপনার অন্তরে) সংরক্ষণ করা এবং তা (আপনার মুখে) পাঠ করানোর দায়িত্ব আমারই। অতএব যখন আমি তা (জিবরীলের মাধ্যমে) পাঠ করি তখন আপনি তার পাঠের অনুসরণ করুন। এরপর তা স্পষ্ট করে বর্ণনা করাও আমার দায়িত্ব। -সূরা কিয়ামাহ (৭৫) : ১৬-১৯

আল্লাহ তাআলা নবীজীকে যেমন কুরআনের পাঠ শেখালেন, তেমনি কুরআনের ব্যাখ্যাও শেখালেন। এরপর তাঁকে নির্দেশ দিলেন, এবার তিনিও যেন মানুষকে একইভাবে কুরআনের ব্যাখ্যা শেখান। সূরা নাহ্লে আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় আদেশ করেছেন-

وَ اَنْزَلْنَاۤ اِلَیْكَ الذِّكْرَ لِتُبَیِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ اِلَیْهِمْ وَ لَعَلَّهُمْ یَتَفَكَّرُوْنَ.

আমি আপনার প্রতি এ যিক্র (কুরআন) নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের সামনে তা স্পষ্ট করে দেন, যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যাতে তারা গভীরভাবে চিন্তা করে। -সূরা নাহ্ল (১৬) : ৪৪

সূরা নিসায়ও আদেশ করেছেন-

اِنَّاۤ اَنْزَلْنَاۤ اِلَیْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَیْنَ النَّاسِ بِمَاۤ اَرٰىكَ اللهُ، وَ لَا تَكُنْ لِّلْخَآىِٕنِیْنَ خَصِیْمًا.

আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে সে অনুসারে মীমাংসা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে বুঝিয়েছেন। আর আপনি খেয়ানতকারীদের পক্ষাবলম্বনকারী হবেন না। -সূরা নিসা (৪) : ১০৫

শুধু তা-ই নয়! আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআন শিক্ষাদানের দায়িত্ব দিয়ে মুমিনদের প্রতি যে বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন, সেটা তিনি কুরআন কারীমে একাধিকবার উল্লেখ করেছেন। সূরা আলে ইমরানে ইরশাদ করেছেন-

لَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ اِذْ بَعَثَ فِیْهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ اَنْفُسِهِمْ یَتْلُوْا عَلَیْهِمْ اٰیٰتِهٖ وَ یُزَكِّیْهِمْ وَ یُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِكْمَةَ، وَ اِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِیْ ضَلٰلٍ مُّبِیْنٍ.

নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদেরই মধ্য থেকে। তিনি তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদের পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন। নিশ্চয়ই এর আগে তারা স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে ছিল। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৬৪

সারকথা, মানুষের হেদায়েতের জন্য যত নির্দেশনা জরুরি, সমস্ত নির্দেশনা আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। সেসব নির্দেশনার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুইটি নির্দেশনা হল-

১. রাসূলের প্রতি ঈমান ও আনুগত্য।

২. রাসূল কর্তৃক মুমিনদেরকে কুরআনের ব্যাখ্যা ও বিধিবিধান শিক্ষাদান।

এখান থেকে এ বিষয়টা দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার যে, কুরআনেরই সুস্পষ্ট আদেশ হল- সঠিকভাবে কুরআন অনুধাবনের জন্য অবশ্যই রাসূলের শিক্ষা ও আদর্শ আঁকড়ে ধরতে হবে। তাঁর শেখানো নীতির আলোকে কুরআন বুঝতে হবে এবং কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। তাঁর শিক্ষাকে অর্থাৎ তাঁর হাদীসকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করে কুরআন বুঝতে চাওয়া মানে কুরআনের সুস্পষ্ট আদেশ অমান্য করা।

কিন্তু হাদীস অস্বীকারকারীরা একদম নিজেদের পক্ষ থেকে একটা কথা কুরআনের উপর চাপিয়ে দিয়ে কুরআন ও হাদীসের মধ্যে সংঘর্ষ দেখানোর চেষ্টা করেছেন আর দাবি করেছেন, হাদীস মানলে কুরআনের বিরুদ্ধাচরণ করা হবে। বলা বাহুল্য, তাদের এ কথা কুরআনের স্পষ্ট তাহরীফ ও বিকৃতি।

তারা এ বিকৃতি ঘটানোর আগে ভেবেও দেখেননি, তাদের এ বিকৃতি কিছুতেই সফল হবার নয়। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো সূরা নাহ্লের ৮৯ নং আয়াত, যেটাকে বিকৃত করে তারা এতসব কাণ্ড ঘটিয়েছেন, সেটার ব্যাখ্যাও তিনি সাহাবায়ে কেরামকে শিখিয়ে গেছেন। সাহাবায়ে কেরাম পরবর্তীদের শিখিয়েছেন। এভাবে সবযুগেই এর সঠিক ও প্রতিষ্ঠিত অর্থটি মুসলমানদের মাঝে পরিচিত ছিল ও আছে। সেজন্য বর্তমান যুগের এই গুটিকয়েক হাদীস অস্বীকারকারী ছাড়া আর কেউই এ আয়াত থেকে এমনটা বোঝেনি আর বোঝার প্রশ্নই আসে না।

সবশেষে নবীজীর বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করে এ প্রসঙ্গের ইতি টানছি। তাবেয়ী আলকামা রাহ. থেকে বর্ণিত-

عَنْ عَبْدِ اللهِ، قَالَ: لَعَنَ اللهُ الوَاشِمَاتِ وَالمُوتَشِمَاتِ،وَالمُتَنَمِّصَاتِ وَالمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ، المُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللهِ.

فَبَلَغَ ذَلِكَ امْرَأَةً مِنْ بَنِي أَسَدٍ يُقَالُ لَهَا أُمُّ يَعْقُوبَ، فَجَاءَتْ فَقَالَتْ: إِنَّه بَلَغَنِي عَنْكَ أَنَّكَ لَعَنْتَ كَيْتَ وَكَيْتَ، فَقَالَ: وَمَا لِي لا أَلْعَنُ مَنْ لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَمَنْ هُوَ فِي كِتَابِ اللهِ؟

فَقَالَتْ: لَقَدْ قَرَأْتُ مَا بَيْنَ اللَّوْحَيْنِ، فَمَا وَجَدْتُ فِيهِ مَا تَقُولُ، قَالَ: لَئِنْ كُنْتِ قَرَأْتِيهِ لَقَدْ وَجَدْتِيهِ، أَمَا قَرَأْتِ: وَمَا اٰتٰىكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَ مَا نَهٰىكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا.

قَالَتْ: بَلَى، قَالَ: فَإِنَّه قَدْ نَهَى عَنْهُ.

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আল্লাহর লানত ওসব নারীর প্রতি, যারা অন্যের শরীরে উল্কি অংকন করে ও নিজের শরীরে উল্কি অংকন করায় এবং যারা সৌন্দর্যের জন্য ভ্রু-চুল উপড়িয়ে ফেলে ও দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে। এসব নারী আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধনকারী।

তাঁর এ কথা আসাদ গোত্রের উম্মে ইয়াকুব নামক এক মহিলার কাছে পৌঁছল। সে এসে বলল, আমি জানতে পেরেছি, আপনি এ ধরনের মহিলাদের প্রতি লানত করেন।

ইবনে মাসউদ রা. বললেন, আমি কেন এমন মানুষদের প্রতি লানত করব না, যাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লানত করেছেন এবং যাদের কথা আল্লাহর কিতাবে আছে?

মহিলাটি বলল, আমি তো দুই ফলকের মাঝে যা আছে (অর্থাৎ সম্পূর্ণ কুরআন) পড়েছি, কিন্তু আপনি যা বলছেন তা পাইনি।

তিনি বললেন, তুমি যদি (ভালোভাবে বুঝে-শুনে) পড়তে তবে অবশ্যই পেতে। তুমি কি পড়নি-

وَ مَاۤ اٰتٰىكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَ مَا نَهٰىكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا.

[রাসূল তোমাদের যা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর আর যা বারণ করেছেন তা থেকে বিরত থাক। -সূরা হাশর (৫৯) : ০৭]

মহিলাটি বলল, হাঁ।

ইবনে মাসউদ রা. বললেন, তিনিই তো নিষেধ করেছেন এ থেকে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৮৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২১২৫

যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস ও শিক্ষাকে ‘কুরআনে নেই’ বলে প্রত্যাখ্যান করে, তাদের জন্য এ ঘটনায় শিক্ষা রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top