
ডেস্ক রিপোর্ট
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার ইয়ারপুর গ্রামের মাটির উঠোনে সকালের নরম রোদ পড়েছে। কৌতূহলী গ্রামবাসী আর স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন এক মানুষকে। সবার চোখ নেমে আসে তার পায়ের দিকে। যে পা ১৭ বছর ধরে খালি ছিল, সেই পায়েই আজ নতুন জুতা। দৃশ্যটি নিছক ব্যক্তিগত নয়- এ যেন দীর্ঘ এক রাজনৈতিক অঙ্গীকারের নীরব সমাপ্তি।
জানা গেছে, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রে বিএনপিকে নিয়ে সমালোচনা করায় মর্মাহত হয়েছিলেন ইয়ারপুর গ্রামের বিএনপি নেতা সুরুজ পাঠান। এরপর থেকেই প্রতিজ্ঞা করেন দল ক্ষমতায় না এলে জুতা পরবেন না। সেই থেকে তিনি আর জুতা পরেননি। জুতা না পরার কারণে অনেকেরই হাসি-ঠাট্টার পাত্র হয়েছিলেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। জুতাও পরেছেন সুরুজ পাঠান। নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ভূঁইয়া স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ে বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সুরুজ পাঠানকে জুতা পরিয়ে দেন।
নেত্রকোনার সীমান্তঘেঁষা কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুরা ইউনিয়নের ইয়াপুরপুর গ্রামে সুরুজ পাঠানের বাড়ি। তিনি ওই গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান বিএনপির সভাপতি। স্থানীয়ভাবে তিনি পরিচিত একজন নিবেদিতপ্রাণ বিএনপি কর্মী হিসেবে। তার রাজনৈতিক জীবনের বাঁকবদল ঘটে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে। ভোটকেন্দ্রে প্রতিপক্ষের কটূক্তি ও অপমানজনক আচরণের শিকার হন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, সেদিন তাকে কেন্দ্র থেকে অপমান করে বের করে দেওয়া হয়। অপমানের সেই ক্ষণেই তিনি জুতা ফেলে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করেন— দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না ফেরা পর্যন্ত আর কখনো জুতা পরবেন না।
এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ অধ্যায়। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, কাদা মাড়িয়ে খালি পায়ে চলেছেন তিনি। রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল-সমাবেশ, গ্রাম থেকে গ্রামে সংগঠনের কাজ— সবখানেই ছিলেন সক্রিয়। সংসারের টানাপোড়ন ছিল নিত্যসঙ্গী। দিনমজুরির আয়ে পরিবার চালাতে গিয়ে নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ ছিল না। পরিবার ও প্রতিবেশীরা বহুবার অনুরোধ করেছেন সিদ্ধান্ত বদলাতে, কিন্তু শপথ থেকে একচুলও সরেননি তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর যেন তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। লেংগুরা গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের আবহ। সেই প্রেক্ষাপটেই কলমাকান্দা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তার বাড়িতে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন জুতা পরিয়ে দেন। করতালি ও স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে উঠোন।
জুতা পায়ে দিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সুরুজ পাঠান বলেন, ২০০৮ সালে আমাকে অপমান করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সেদিনই জুতা ফেলে প্রতিজ্ঞা করি— দল না জেতা পর্যন্ত আর জুতা পরব না। আজ সেই শপথ পূরণ হয়েছে। মনে হচ্ছে, শুধু পায়ে জুতা নয়— মাথাও উঁচু হয়েছে।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সুরুজ পাঠান আমাদের দলের প্রতি ত্যাগ ও একনিষ্ঠার অনন্য উদাহরণ। দুঃসময়ে যারা অবিচল থেকেছেন, তাদের আত্মত্যাগই আজকের অর্জনের ভিত্তি। আমরা এমন একজন কর্মীকে নিয়ে গর্বিত।
লেংগুরা গ্রামের মানুষ বলছেন, এটি কেবল একজন নেতার ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞা পূরণের ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘ ১৭ বছরের বিশ্বাস, প্রতিবাদ আর রাজনৈতিক অটলতার প্রতীক। খালি পায়ের সেই পথচলা আজ জুতা পায়ে নতুন অধ্যায়ে পা রাখল— কিন্তু স্মৃতি হয়ে রইল তার দৃঢ় শপথের ইতিহাস। কালবেলা





