বরিশালে বিএনপি ‘দুর্গ’ রক্ষা করলেও উত্থান ঘটেছে জামায়াতের

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভাগের রাজনীতির কেন্দ্রস্থল বরিশাল-৫ বা সদর আসনে ভোটের ফলে দৃষ্টি ছিল সবার। এই আসনে বিএনপির বিপক্ষে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীম। একইভাবে বরিশাল-৩ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদকে ঘিরেও তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস ছিল। আশানুরূপ ভোট পেলেও জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেননি দুটি রাজনৈতিক দলের দুই উপ-প্রধান নেতা। ধরাশায়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থীদের কাছে। শুধু দুটি আসন নয়, বরিশাল জেলার ছয়টি আসনেই ভরাডুবি হয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলনসহ অন্য দলগুলোর। জামানতও হারিয়েছেন বিভিন্ন দলের ২১ জন প্রার্থী।

মূলত বিএনপির বিপক্ষে দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বী, বিকল্প শক্তির অনুপস্থিতি, বিএনপির নেতৃত্বে আস্থা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি অনীহা, ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে দুই দলের টানাটানি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের ঐক্যে ফাটল, নারীবিদ্বেষী আচরণ তাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন ভোটারা।

ভোটে না জিতলেও প্রাপ্ত ভোটের পরিসংখ্যানে বরিশালের রাজনীতিতে উত্থান ঘটেছে জামায়াতে ইসলামীর। বিগত ১৭ বছরে এই দলটির জনসমর্থন অনেকাংশে বেড়েছে।

ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরিশাল-৫ (সদর ও সিটি করপোরেশন) আসনে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। চরমোনাই পীরের এই আসনটি এবার ইসলামী আন্দোলনের ঘরে থাকবে—এমন গুঞ্জন ছিল। তা ছাড়া আসনটি নিয়েই জামায়াত-ইসলামী আন্দোলন জোটে ফাটলের সূত্রপাত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আসনটি চরমোনাই পীরকে ছেড়ে দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। এর পরও বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনটিতে সুবিধা করতে পারেনি ইসলামী আন্দোলন।

আসনটিতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৪ ভোট। ৪০ হাজার ১০২ ভোটের ব্যবধানে টানা পঞ্চমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মজিবর রহমান সরোয়ার।

বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৌলঝাড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন ৯৯ হাজার ৪১৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের কামরুল ইসলাম পেয়েছেন ৪৫ হাজার ১৪০ ভোট। ৫৪ হাজার ২৭৮ ভোটের ব্যবধানে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জহির উদ্দিন স্বপন।

আসনটিতে বিএনপির জহির উদ্দিন স্বপন এবং বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রকৌশলী আব্দুস সোবহানের মধ্যে লড়াইয়ের ধারণা ছিল ভোটারদের মধ্যে। কিন্তু লড়াই হয়েছে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে। ৪৪ হাজার ১৮৮ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আব্দুস সোবহান। দলের বিপক্ষে গিয়ে বিদ্রোহ করা এবং দল থেকে বহিষ্কারের কারণেই এবারের নির্বাচনে তৃতীয় হয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।

বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু ১ লাখ ৪১ হাজার ২৮০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আব্দুল মান্নান পেয়েছেন ৭১ হাজার ৯৮৯ ভোট। ৬৯ হাজার ২৯১ ভোটের ব্যবধানে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সান্টু। আসনটিতে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলনের দুর্বল প্রার্থিতার কারণে বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি।

বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসনে ৮০ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ঈগল প্রতীকে পেয়েছেন ৬১ হাজার ১৯২ ভোট। ১৯ হাজার ৭৩৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন ফুয়াদ।

স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বাবুগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা নন। তা ছাড়া বরিশালের জনপদে তার বিচরণ ছিল না আগে থেকে। গণঅভ্যুত্থানেরও অনেক পরে নির্বাচন ঘিরে মুলাদী-বাবুগঞ্জে যাতায়াত বাড়ে তার। এর পরও আসনটিতে তার ৬১ হাজারের বেশি ভোট পাওয়া অনেকটা চমকে যাওয়ার মতো।

বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলনের দুজন হেভিওয়েট নেতাকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান। তিনি ১ লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আব্দুল জব্বার ৭৪ হাজার ৬৮৪ ভোট পেয়েছেন। আর ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব এছহাক মুহাম্মাদ আবুল খায়ের পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫৩ ভোট। ৫৩ হাজার ৬৩৮ ভোটের ব্যবধানে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন রাজীব আহসান।

জেলার মধ্যে নদীবেষ্টিত এই আসনটি টার্গেট ছিল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের। এ কারণে ভোটের আগে বিভাগীয় শহরের বাইরে মেহেন্দীগঞ্জে নির্বাচনী জনসভা করেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। বিএনপির অন্যতম ঘাঁটি এ আসনটির তরুণ ভোটারদের টানতে চেয়েছিলেন দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখার দিকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের। মূলত বিএনপির বিপক্ষে দুজন শক্ত প্রার্থী থাকলেও তারা একজনও ওই আসনের স্থায়ী বাসিন্দা নন। এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী নিজের নির্বাচনী এলাকার ভোটারই ছিলেন না। তার ওপর দুই দলের ভোট বিভক্ত হওয়ায় বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয় নিশ্চিত হয় ধানের শীষের।

বরিশাল সদরে জামায়াতবিহীন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীম দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও বরিশাল-৬ আসনে তার অবস্থান ছিল তৃতীয়। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ৮২ হাজার ২১৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের বরিশাল জেলার সেক্রেটারি মো. মাহামুদুন্নবী তালুকদার ৫৫ হাজার ৯৮৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীম ২৯ হাজার ১৪৬ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন। ২৬ হাজার ২২৯ ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বরিশাল দক্ষিণ জেলা কমিটির আহ্বায়ক আবুল হোসেন খান।

বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল কালাম শাহিন বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে বরিশাল অঞ্চলের মানুষ বিএনপিকে ভালোবাসে। বিএনপির ওপর জনগণের আস্থা আছে বলেই বিভাগজুড়েই বিএনপির ভূমিধস বিজয় হয়েছে। জনগণ বুঝিয়ে দিয়েছে ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার মধ্যে ব্যবধান কতটুকু।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বরিশাল জেলার বিভিন্ন উপজেলার বৃহৎ অংশজুড়ে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা রয়েছে। এমনকি চরমোনাই পীরের যেই এলাকা, সেখানকার বড় একটি এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাস। যে কারণে বৃহৎ অংশের অন্য ধর্মের ভোটাররা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চান না বলে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলনকে ভোট দেননি। তারা বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উন্মেষ রায় বলেন, গত ১৭ বছরে বিএনপি সেভাবে ভোটের মাঠে সুবিধা করতে পারেনি। সে কারণে তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও জয়ী হওয়ার প্রবল চেষ্টা ছিল। দলীয় প্রধানের নির্দেশনায় নির্বাচনকেন্দ্রিক সাংগঠনিক কার্যক্রমগুলোও যুগোপযোগী ছিল। দল যাকে প্রার্থী করেছে, তার পক্ষেই সবাই জোটবদ্ধ হয়ে কাজও করেছে। এসব কারণেই বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজয় পেয়েছে। কালবেলা অনলাইন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top